দেশে টানা ভূমিকম্প: আতঙ্ক নয়, সচেতনতা—নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি
গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অল্প বিরতিতে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ বেড়েছে। শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে তিনবার কম্পন অনুভূত হয়, আর তার আগের দিনও রাজধানীসহ দেশের বড় একটি অংশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এমন পরিস্থিতিতে বহু মানুষ ভীত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান; অনেকে তাড়াহুড়ায় আহতও হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—বারবার কম্পন অনুভূত হওয়া ভূত্বকের স্বাভাবিক চাপ–বদলের লক্ষণ হতে পারে, তবে তা কখনোই অবহেলা করার বিষয় নয়।
পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, মানুষের সচেতনতা, শান্ত থাকা এবং পূর্বপ্রস্তুতি—এসবই বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।
তাই ভূমিকম্প সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান যত গভীর হবে, নিরাপত্তার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
ভূমিকম্প: কেন হয়, কীভাবে কাজ করে
পৃথিবীর ভেতরের প্লেটগুলোর চলাচল
পৃথিবীকে আমরা যেনো স্তরযুক্ত একটি বিশাল বল হিসেবে ভাবতে পারি। এর ভেতরে রয়েছে লিথোস্ফিয়ার—যেখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেট ভাসমান অবস্থায় থাকে।
এই প্লেটগুলো একে অপরের সাথে—
ধাক্কা খায়
সরে যায়
দূরে সরে যায়
মাঝে মাঝে আটকে থাকে
যখন প্লেটগুলো আটকে থাকা চাপ হঠাৎ মুক্ত হয়, তখনই ভূমিকম্প হয়।
ফল্ট লাইন বা ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল
বাংলাদেশের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় রয়েছে। বিশেষ করে:
সিলেট অঞ্চল
চট্টগ্রাম
ত্রিপুরা–মিজোরাম সীমান্ত এলাকা
বঙ্গোপসাগরের কিছু অংশ
এসব অঞ্চলে টেকটোনিক চাপ বেশি থাকায় মাঝেমধ্যে কম্পন অনুভূত হওয়া স্বাভাবিক।
ছোট কম্পন মানেই বড় বিপদের আগাম বার্তা নয়
অনেক সময় ছোট কম্পন হয় এবং তা দিয়ে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন—ছোট কম্পন বারবার হলে জনগণকে সচেতন হওয়া উচিত।
ভূমিকম্পের সময় সাধারণ মানুষের ভুল আচরণ
ভয়ে ও আতঙ্কে মানুষ কখনো কখনো এমন কিছু করে ফেলেন যা আসল ভূমিকম্পের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক:
ভবন থেকে লাফ দিয়ে নামা
লিফট ব্যবহারের চেষ্টা
ভিড় করে সিঁড়িতে দৌড়াদৌড়ি
জানালার পাশে দাঁড়ানো
ভারী আসবাবের কাছে অবস্থান করা
ভিডিও করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা ভুলে যাওয়া
এই আচরণগুলোই বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তাই নিরাপত্তা–নিয়ম শেখা ও তা অনুশীলন করা জরুরি।
ভূমিকম্পের সময় করণীয়: সবচেয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা
ঘরের ভেতরে থাকলে—নিরাপত্তার বৈজ্ঞানিক নিয়ম
Drop – Cover – Hold
বিশ্বব্যাপী এই তিন ধাপকে সবচেয়ে কার্যকর বলে ধরা হয়।
DROP:
হঠাৎ কম্পনে পড়ে যাওয়ার আগেই নিজে থেকে নিচু হয়ে বসে পড়ুন।
COVER:
শরীর—বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়—টেবিল বা শক্ত আসবাবের নিচে ঢুকিয়ে সুরক্ষিত করুন।
এটি পড়ে যাওয়া জিনিস থেকে রক্ষা করে।
HOLD:
কাঁপুনি চলাকালে আসবাব শক্ত করে ধরে রাখুন যেন সেটি সরে গেলে আপনিও নিরাপদে থাকতে পারেন।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
রান্নাঘরে থাকলে চুলা বন্ধ করে দ্রুত দূরে যান
ঘরের মাঝখানে থাকার চেষ্টা করুন
দরজা ধরে দাঁড়ানো নিরাপদ নয়
কাচের জিনিস ও বড় জানালার পাশে যাবেন না
ভারী আলমারি, ফ্রিজ, বুকশেলফ থেকে দূরে থাকুন
উঁচু ভবনে থাকলে
উঁচু ভবনে থাকা মানেই বিপদ—এ ধারণাটি ভুল।
সঠিক আচরণেই নিরাপত্তা পাওয়া যায়।
নির্দেশনা:
কম্পন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভেতরে থাকুন
লিফট ব্যবহার করবেন না
লাফ দেবেন না
কম্পন থেমে গেলে সিঁড়ি দিয়ে নামুন
আগেই পরিবারকে জানিয়ে রাখুন কোন সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়া নিরাপদ
বাইরে থাকলে
বাইরে থাকা তুলনামূলক নিরাপদ হলেও আশেপাশে ঝুঁকি থাকা স্বাভাবিক।
যা করবেন:
বড় ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছপালা—এসব থেকে দূরে যান
খোলা জায়গায় দাঁড়ান
ভিড় করে দৌড়াদৌড়ি করবেন না
রাস্তার মাঝখানে থাকলে যানবাহন থেকে দূরে সরে যান
গাড়িতে থাকলে
গাড়ি থামান
ভেতরে বসে থাকুন
ব্রিজ, ওভারপাস, আন্ডারপাস বা খুঁটির নিচে গাড়ি থামাবেন না
কম্পন থামলে পরিস্থিতি দেখে গাড়ি চালান
অফিস, মার্কেট বা সিনেমা হলে থাকলে
ভিড়ের জায়গায় আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে—যা বড় দুর্ঘটনার কারণও।
যা করবেন:
সাথে সাথে বের হওয়ার জন্য দৌড়াবেন না
মাথা দুহাতে ঢেকে নিচু হয়ে বসুন
নির্দেশনা থাকলে তা অনুসরণ করুন
কম্পন থেমে গেলে সুশৃঙ্খলভাবে বের হোন
আটকে গেলে বা চাপা পড়লে
(এখানে কোনো আহত–বিবরণ বা গ্রাফিক বর্ণনা দেওয়া হয়নি, নীতিমালা অনুযায়ী)
অতিরিক্ত নড়াচড়া না করে শক্তি বাঁচান
ধুলাবালি ঢোকা থেকে রক্ষা করতে নাক–মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন
আপনার অবস্থান জানানোর জন্য আশপাশে টোকা দেওয়ার মতো শব্দ করতে পারেন
শান্ত থাকুন—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ভূমিকম্প থেমে গেলে: পরবর্তী করণীয়
পরিবার ও আশপাশের মানুষের অবস্থা দেখে নিন
দালানের কোথাও ফাটল বা ঝুঁকি আছে কি না—সেটি লক্ষ্য করুন
গ্যাস লাইন, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি লাইন—এসব চেক করুন
ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে অযথা ঢুকবেন না
জরুরি নম্বর হাতের কাছে রাখুন
জরুরি প্রস্তুতি কিট: পরিবারপ্রতি Earthquake Kit
প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি প্রস্তুতি ব্যাগ রাখা উচিত। এর মধ্যে থাকতে পারে—
টর্চ ও ব্যাটারি
পাওয়ার ব্যাংক
ছোট রেডিও
পানি
শুকনো খাবার
প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম
প্রয়োজনীয় ওষুধ
বাঁশি (হুইসল)
গুরুত্বপূর্ণ নথির কপি
একটি ছোট ছুরি বা মাল্টি–টুল
কাপড় ও মাস্ক
জুতা
পরিবার ও শিশুদের জন্য প্রশিক্ষণ
মাসে একবার ভূমিকম্প মহড়া (Drill) করুন
শিশুদের শেখাবেন—ঘুরতে ঘুরতে কীভাবে টেবিলের নিচে যাবে
পরিবারের সকলের জানা উচিত—কোন দিক দিয়ে বের হতে হবে
রাতে বিছানার পাশে টর্চ রাখা ভালো
কমিউনিটির ভূমিকা
একটি এলাকায় সবাই সচেতন থাকলে দুর্ঘটনা কমে যায়। তাই—
স্থানীয়ভাবে মহড়া আয়োজন
স্কুল–কলেজে নিয়মিত সচেতনতা ক্যাম্প
ফ্ল্যাট বা ভবনে জরুরি বের হওয়ার পথ চিহ্নিত করা
প্রতিবেশীদের জরুরি নম্বর শেয়ার করা
এসব বিষয় বড় বিপদকে ছোট করে দেয়।
শেষ কথা: ভূমিকম্প বন্ধ হবে না, কিন্তু মৃত্যু ও দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব
ভূমিকম্প প্রাকৃতিক ঘটনা—এটিকে থামানো যায় না।
কিন্তু সঠিক জ্ঞান, অনুশীলন, প্রস্তুতি ও শান্ত আচরণ—এই চারটি জিনিস আমাদের বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।
সচেতনতার মাধ্যমে আমরা পরিবার, সমাজ ও দেশ—সবাইকে নিরাপদ রাখতে পারি।