বাংলাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে তথ্য নিরাপত্তা, ভুয়া খবর প্রতিরোধ ও গণমাধ্যম দক্ষতা বাড়াতে ইউনেস্কোর নতুন নিয়োগ: দীর্ঘ বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশের তথ্যপ্রবাহ, গণমাধ্যম স্বাধীনতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা তীব্র হচ্ছে। বিশ্বের রাজনৈতিক ঘটনাবলিতে গত এক দশকে একটি বিষয় বেশি আলোচিত—ভুয়া খবর বা misinformation–এর প্রভাব। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় এটি গণমাধ্যমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO) ঢাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিচ্ছে:
Junior Consultant – Media and Elections
এই পদটি কেবল একটি চাকরি নয়—বরং নির্বাচনকালীন সঠিক তথ্যচর্চা, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল পরিসরে ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে একটি বড় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ। নিয়োগটি জাতিসংঘের BALLOT Project–এর আওতায়, যা বাংলাদেশে নির্বাচনী পরিবেশকে আরও সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও মানবাধিকারবান্ধব করতে কাজ করছে।
বিশ্বব্যাপী ভুয়া তথ্যের প্রভাব—বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিতে?
গত কয়েক বছরে বিশ্বে অনেক নির্বাচনেই misinformation ও online manipulation বড় ভূমিকা রেখেছে। যেমন—
২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচন
২০১৯ সালের ভারতীয় নির্বাচন
২০১৭ সালের ফরাসি নির্বাচন
ব্রেক্সিট রেফারেন্ডাম
এসব ক্ষেত্রে ভুয়া তথ্য, বট অ্যাকাউন্ট, টার্গেটেড মিথ্যা প্রচারণা ও deepfake ভিডিও বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়ায় দেশে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বেশি।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে—
নির্বাচনের সময় ৭০% এর বেশি মিথ্যা তথ্য ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে ছড়ায়
রাজনৈতিক বিষয়ক ভিডিও বা স্ট্যাটাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ যাচাইহীন বা মিথ্যা
অনলাইনে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা ভোটিং সম্পর্কিত ভুল তথ্য দ্রুত ছড়ায়
এ কারণে মিডিয়া–সম্পর্কিত নির্বাচন প্রকল্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউনেস্কো–র এই নতুন পদটিও সেই চাহিদারই ফল।
BALLOT Project—বাংলাদেশে এর ভূমিকা কী?
BALLOT Project (Bangladesh’s Advance in Learning, Local Outreach, and Transparency) হলো একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রকল্প। এটি তিনটি জাতিসংঘ সংস্থা পরিচালনা করছে:
UNDP — নির্বাচনী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ
UNESCO — গণমাধ্যম, তথ্য নিরাপত্তা, সাংবাদিক প্রশিক্ষণ
UN Women — নারী অংশগ্রহণ, নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা
এই প্রকল্পের একটি বড় অংশ হলো—
নির্বাচনী সময় গণমাধ্যম ও অনলাইন তথ্য-পরিবেশকে স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল রাখা
ভুয়া সংবাদ প্রতিরোধে সাংবাদিক ও মিডিয়া হাউসগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো
Fact-checking ও ডেটা যাচাই ব্যবস্থার উন্নয়ন
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় নীতি ও সরঞ্জাম ব্যবহার
নতুন কনসালট্যান্ট মূলত এই কাজগুলোর বাস্তবায়নে সক্রিয় থাকবেন।
পদের ভূমিকা: শুধু প্রশাসনিক নয়, প্রভাব–সৃষ্টিকারী কাজ
এটি এমন একটি পদ যেখানে মিডিয়ার ভবিষ্যৎ নীতিমালা গঠনে বাস্তব অবদান রাখা যায়। দায়িত্বগুলো শুধু কাগজপত্র নয়, বরং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ, নীতি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সমন্বিত।
মিডিয়া মনিটরিং ও অনলাইন তথ্য প্রবাহ বিশ্লেষণ
কনসালট্যান্টকে—
নির্বাচনী সময়ে মিডিয়ার আচরণ কেমন?
কোন ধরনের ভুয়া খবর বেশি ছড়ায়?
কোন প্ল্যাটফর্মে misinformation বেশি?
—এসব বিশ্লেষণ করতে হবে।
Fact-checking ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করা
বাংলাদেশে এখন কয়েকটি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান আছে, তবে অধিকাংশ মিডিয়া হাউসে স্বাধীন fact-check desk নেই।
এই পদে থাকা ব্যক্তি তাদের সঙ্গে কাজ করবে, প্রশিক্ষণ দেবে এবং fact-check collaboration গড়ে তুলবে।
৩. সাংবাদিক নিরাপত্তা বিষয়ে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসরণ
UN Plan of Action on Safety of Journalists অনুসারে—
নির্বাচনের সময় সাংবাদিকদের হুমকি
অনলাইন হয়রানি
গ্রাউন্ড-লেভেল সহিংসতা
—এসব পর্যবেক্ষণ করে সুপারিশ তৈরি করবেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নীতি–সংলাপ
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাব বা অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক পরিচালনা হবে।
মিডিয়ার ডিজিটাল স্কিল উন্নয়ন
অনলাইন নিরাপত্তা
fact-check টুল ব্যবহার
কার্যকর ডেটা জার্নালিজম
ভুয়া ভিডিও শনাক্তকরণ
এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম পরিচালনা করতে হবে।
এগুলো বাংলাদেশের মিডিয়া উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
যোগ্যতার গভীর বিশ্লেষণ—কারা উপযুক্ত প্রার্থী?
ইউনেস্কোর কাজ অত্যন্ত নীতিমূলক, তাই এতে—
বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো সম্পর্কে ধারণা
গবেষণা ক্ষমতা
প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা
মিডিয়া বা নির্বাচনী ক্ষেত্রের জ্ঞান
—এসব দক্ষতা প্রয়োজন।
এছাড়া—
Gender and social inclusion বিষয়ে সচেতনতা
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ দক্ষতা
মানবাধিকার বিষয়ক কাজের অভিজ্ঞতা
জাতিসংঘের নীতিমালা সম্পর্কে ধারণা
—এসবও বাড়তি সুবিধা।
চুক্তির সুবিধা—বাংলাদেশি চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক
আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ
উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব
গবেষণাভিত্তিক কাজের সুযোগ
নীতি পর্যায়ে প্রভাব রাখার সুযোগ
বহুজাতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ
উচ্চমানের প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ
বেতন—
৬০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকা,
যা বাংলাদেশের মিডিয়া বা উন্নয়নখাতের জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদগুলোর তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক।
আবেদন প্রক্রিয়া—এক নজরে
UNESCO PHF ফর্ম পূরণ
সিভি
স্টেটমেন্ট অব ইন্টারেস্ট
অভিজ্ঞতার প্রমাণ (যদি থাকে)
recruitment.dhaka@unesco.org
শেষ সময়: ২৫ নভেম্বর ২০২৫
এই নিয়োগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মিডিয়া পরিবেশে কী পরিবর্তন আনবে?
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে—
ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে স্থায়ী কাঠামো তৈরি হবে
সাংবাদিক ও মিডিয়া–প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়বে
নির্বাচনের সময় তথ্যচিত্র আরও স্বচ্ছ হবে
মিডিয়া–নীতি শক্তিশালী হবে
আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে
সব মিলিয়ে এই পদ বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক তথ্য–পরিবেশকে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করার বড় প্রচেষ্টা।